ফরিদপুরে কালীবাড়ি মন্দিরের কালীমূর্তি চুরি: ৬ দিনের মধ্যে উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৪
বিশেষ প্রতিনিধি:
ফরিদপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী পুরাতন কালীবাড়ি মন্দির থেকে চুরি হওয়া কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি, স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকার ও বিভিন্ন প্রতিমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার ছয় দিনের মধ্যে চুরি যাওয়া কালীমূর্তিসহ অধিকাংশ মালামাল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুর জেলা পুলিশের উদ্যোগে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজি।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে পূজা-অর্চনা শেষে কালীমাতাকে শয়ন দিয়ে মন্দিরের লোহার দরজা, শাটার, সামনের কাঠের দরজা ও কেচি গেটে তালা লাগিয়ে চলে যান মন্দিরের সেবায়েত ও কমিটির সভাপতি কুশল চক্রবর্তী।
পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর ভোরে মন্দিরে পূজা করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, মন্দিরের সব তালা কাটা এবং দরজা খোলা। ভেতরে গিয়ে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি দেখতে না পেয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান। একই সঙ্গে মূর্তির গায়ে থাকা স্বর্ণালংকার, পিতলের বিভিন্ন প্রতিমা ও রৌপ্যের অলংকারও চুরি হয়।
এ ঘটনায় কুশল চক্রবর্তীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা নম্বর-৪৩, দণ্ডবিধির ৪৫৭/৩৮০ ধারায় মামলা করা হয়।
মামলার পর পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), কোতোয়ালি থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও তদন্তকারী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একাধিক দল তদন্তে নামে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন—আলফাডাঙ্গা থানার বুরাইচ গ্রামের আসাদুজ্জামান সাদ্দাম (৩৮), তার মা সাজেদা বেগম (৬৫), বোয়ালমারীর কান্দাকুল গ্রামের আল আমিন মোল্লা (২৪) এবং বোয়ালমারী এলাকার আতিয়ার রহমান।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সাজেদা বেগমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ির রান্নাঘরের মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা চুরি হওয়া স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকার এবং ছয়টি পিতলের প্রতিমা উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া আসাদুজ্জামান সাদ্দাম ও আল আমিন মোল্লার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালমারী থানার রুপাপাত এলাকার একটি বাড়ির পেছনে মাটির নিচে পুঁতে রাখা কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে সাদ্দামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালমারী বাজারের স্বর্ণপট্টির একটি জুয়েলারি দোকানে অভিযান চালায় পুলিশ। দোকান মালিক আতিয়ার রহমানের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, চুরি হওয়া প্রতিমার কানের দুল, টিকলিসহ অন্যান্য অলংকার গলিয়ে তৈরি করা প্রায় আট আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া সব আলামত সাক্ষীদের উপস্থিতিতে জব্দ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, চুরি হওয়া কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটির ওজন প্রায় ২০ কেজি এবং আনুমানিক মূল্য এক কোটি টাকা। মূর্তির গায়ে থাকা প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন পিতলের প্রতিমা ও প্রায় ৩০ ভরি রৌপ্যের অলংকার চুরি হওয়ার অভিযোগ করা হয়।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার আসাদুজ্জামান সাদ্দামের বিরুদ্ধে চুরি, দস্যুতা, ডাকাতি ও মূর্তি চুরিসহ ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। আল আমিন মোল্লার বিরুদ্ধেও একই ধরনের আটটির বেশি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজি বলেন, প্রথমদিকে কোনো নির্দিষ্ট সূত্র না থাকায় ঘটনাটি ক্লু-লেস মনে হলেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে ছয় দিনের মধ্যে চুরির রহস্য উদঘাটন এবং কালীমূর্তিসহ অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া কালীমূর্তি, স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকার ও অন্যান্য প্রতিমাসহ সব আলামত মামলার তদন্তে সংযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply